প্রকৃতিপ্রেমিক, জীববিজ্ঞানী ও লেখক অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা


প্রকৃতিপ্রেমিক, জীববিজ্ঞানী ও লেখক অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা

মানুষ, বৃক্ষের মতো আনত হও, হও সবুজ …’  এমন কথা একজনই বলতে পারেন তিনি হচ্ছেন প্রকৃতিপ্রেমিক, জীববিজ্ঞানী ও লেখক অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা। মূলত তাঁর সাধনা ও ধ্যান ছিল প্রকৃতি নিয়ে। তিনি বৃক্ষকে আপন করে নিয়েছিলেন নিজের সন্তানের স্নেহ-মমতায়। একারণে বৃক্ষের প্রাণের সঙ্গে নিজের প্রাণের অস্তিত্ব অনুভব করতেন। আজকের আলোচনায় আমরা জানতে সক্ষম হবো প্রকৃতিপ্রেমিক, জীববিজ্ঞানী ও লেখক অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা সম্পর্কে।

Dwijen_Sharma_wikipedia

ছবিঃ উইকিপিডিয়া

 

শৈশব জীবন

প্রকৃতির এক মনোরম পরিবেশে বর্তমানে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে ২৯ মে ১৯২৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন দ্বিজেন শর্মা। তাঁর বাবা ভীষক চন্দ্রকান্ড শর্মা ছিলেন একজন গ্রাম্য কবিরাজ এবং মাতা মগ্নময়ী দেবী ছিলেন একজন সমাজসেবী। আর এই কবিরাজ বাড়ীতে ছিল অসংখ্য গাছ-গাছালি এবং নানা ধরনের রঙ-বেরঙের ফুলের গাছ। ফলে শৈশবে তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন পাহাড়-জংগল ও গাছ-গাছালির মাঝে প্রকৃতির এক অপরূপ পরিবেশের আস্বাদ নিতে।

 

শিক্ষা জীবন

একদিকে তিনি প্রকৃতির পরিবেশ থেকে শিক্ষা নেন, অন্যদিকে গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি নেন। পরবর্তী ধাপে লেখাপড়া করেন করিমগঞ্জ পাবলিক হাইস্কুলে। এরপর কলকাতা সিটি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। তারপর সর্বশেষ পর্যায়ে ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।

 

পেশাগত জীবন

১৯৫৮ সালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ শেষে বরিশালের বজ্রমোহন কলেজে শিক্ষকতা পেশা গ্রহন করেন। এরপর ১৯৬৩ সালে ঢাকায় নটরডেম কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালে মস্কোতে সোভেয়েত প্রকাশনা সংস্থা প্রগতি প্রকাশনে অনুবাদক পেশা গ্রহণ করেন এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সেই দায়িত্ব চালিয়ে যান। এ সময়ে তিনি চল্লিশটির বেশি বই অনুবাদ করেন। দেশে ফিরেই তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিতে অনুবাদক হিসেবে যোগ দেন। উল্লেখ্য, তিনি মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস যুদ্ধকালীন সময়ে দেশেই অবস্থান করছিলেন।

 

পারিবারিক জীবন

পারিবারিক জীবনে তিনি ১৯৬০ সালে ডঃ দেবী চক্রবর্তীর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন যিনি ঢাকার সেন্ট্রাল উইমেনস কলেজের দর্শনের অধ্যাপিকা ছিলেন। তাদের দু’সন্তানের মধ্যে ছেলে ডাঃ সুমিত শর্মা বিয়ে করে বাস করতে থাকেন মস্কোতে, আর মেয়ে শ্রেয়সী শর্মা দেশে বসবাস করেন।

 

মানুষ-প্রকৃতির মিশে থাকার সভ্যতা

অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা এর মতে ‘নতুন আরেকটি সভ্যতার কথা চিন্তা করতে হবে যেখানে মানুষ আর প্রকৃতি মিলেমিশে থাকবে।’ তাঁর এই ভাবনা ও চিন্তা-চেতনা একদিনে আসেনি। আজীবন তিনি সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেছেন। প্রকৃতি প্রেমিক দ্বিজেন শর্মার নিজের কথাই এর স্বতস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস রয়েছে।  তিনি তাঁর ৮৫তম জন্মবার্ষিকীতে রাজধানীর গণগ্রন্থাগার সংলগ্ন শওকত ওসমান মিলনায়তনে তরুপল্লব আয়োজিত এক নাগরিক সংবর্ধনা নেওয়ার সময় বলেছিলেন, ’ছোটবেলায় আদিবাসী ছেলেদের সঙ্গে মিশেছি, খেলেছি। বনজঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছি- সেই যে  বনজীবনের প্রতি ভালোবাসা আমার মনে প্রোথিত হয়েছিল সেখান থেকে কোনোদিন আর মুক্তি পাইনি। সেই আদিবাসী জীবন, অরণ্যজীবন- তারই প্রকাশ আজকের আমি।’

 

প্রকাশনা

অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা প্রকৃতি, বিজ্ঞান, শিশুসাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে লিখেছেন প্রচুর। প্রকৃতি নিয়ে তাঁর অন্যতম মৌলিক গ্রন্থ ‘শ্যামলী নিসর্গ’ (১৯৮০,১৯৯৭, ২০১৫ – বাংলা একাডেমী)। এছাড়া অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে ‘সপুষ্পক উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাস’(১৯৮০ – বাংলা একাডেমী), ‘ফুলগুলি যেন কথা’(১৯৮৮, ২০০৪ – বাংলা একাডেমী), ‘গাছের কথা ফুলের কথা’ (১৯৯৯ – শিশু একাডেমী), ‘এমি নামের দুরন্ত মেয়েটি’(১৯৯৫, ১৯৯৯ – শিশু একাডেমী), ‘নিসর্গ নির্মাণ ও নান্দনিক ভাবনা’ (২০০০ – ইউপিএল), ‘সমাজতন্ত্রে বসবাস’(১৯৯৯ – ইউপিএল), ‘জীবনের শেষ নেই’ (১৯৮০, ২০০০ – জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন), ‘বিজ্ঞান ও শিক্ষা: দায়বদ্ধতার নিরিখ’(২০০৩ – জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন), ‘ডারউইন ও প্রজাতির উৎপত্তি’ (১৯৯৭ –  সাহিত্য প্রকাশ),  ‘বিগল যাত্রীর ভ্রমণ কথা’(১৯৯১ –  সাহিত্য প্রকাশ), ‘গহন কোন বনের ধারে’(১৯৯৪ –  সাহিত্য প্রকাশ), ‘হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ডালটন হুকার’(২০০৪ –  সাহিত্য প্রকাশ), ‘বাংলার বৃক্ষ’(২০০১ –  সাহিত্য প্রকাশ), ‘সতীর্থ বলয়ে ডারউইন’ (১৯৭৪, ১৯৮৪, ১৯৯৯ – মুক্তধারা), ‘মম দুঃখের সাধন’ (১৯৯৪ –  সাহানা), ‘আমার একাত্তর ও অন্যান্য’ (২০০৮ – অনুপম প্রকাশনী)।

 

সম্মাননা ও পুরষ্কার

তিনি তাঁর নিঃস্বর্গ সাধনা ও অবদানের ফলস্বরূপ বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সংস্থা থেকে পুরষ্কৃত ও সংবর্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমী অ্যাওয়ার্ড, ২০১৫ সালে একুশে পদক ও ডঃ কুদরত-এ-খোদা স্বর্ণপদক। অন্যান্য পুরষ্কারের মধ্যে এম নুরুল কাদের শিশু-সাহিত্য পুরষ্কার ও ২০০১ সালে চ্যানেল আই কর্তৃক প্রকৃত সংরক্ষণ পদক।  প্রখ্যাত লেখক ও জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভোর রাত ৩টা ৫০ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

১. উইকিপিডিয়া

২. ঝরে গেল আমাদের বড়বৃক্ষ -দ্বিজেন শর্মা, www.biggani.org

৩. দৈনিক প্রথমআলো, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক ইত্তেফাক

৪. বিডিনিউজ২৪.কম

 

প্রথম প্রকাশঃ বিজ্ঞানী.অর্গ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>