এক নাদান মুসাফিরের আত্মলিপি (পর্ব-৫)


এক নাদান মুসাফিরের আত্মলিপি (পর্ব-৫)

আমি নিজেকে আম-জনতার একজন সাধারন কাতারের মানুষ মনে করি। আকাশ চুম্বি কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। নিত্যদিনের চাহিদা তো থাকবে। এটাকে কেবল উপেক্ষা করতে পারি না। তবে আমার মাঝে ক্রমাগত নিজেকে ভেঙ্গে গড়ে বিনির্মানের প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। সঙ্গত কারণে আজকের আলোচনার বিষয় এক নাদান মুসাফিরের আত্মলিপি (পর্ব-৫) যখন বদলাতে চাই নিজেকে শিরোনামে।

যখন বদলাতে চাই নিজেকে

ek nadan musafir-5

মানুষ চাইলেই খুব সহজে তার স্বভাব – চরিত্র , আচার – আচরণ পরিবর্তন করতে পারে না। এমনকি তার বুদ্ধিমত্তা ও শারীরিক আকার আকৃতিও  সহজভাবে বদলাতে পারে না। তবে একজন মানুষের ইচ্ছাশক্তি মানুষকে অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে নেয়, মানুষ নিজেকে বদলে ফেলতে সক্ষম হয় অনেকাংশে। এ প্রসংগে উল্লেখ করতে চাই বিখ্যাত পার্সি কবি জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমির একটি লেখা যেখানে বলা হয়েছে- “গতকাল আমি চতুর ছিলাম। তাই আমি পৃথিবীটাকে বদলে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি জ্ঞানী, তাই নিজেকে বদলে ফেলতে চাই।”

 

তাহলে নিজেকে বদলানোর জন্যে চাই ইচ্ছাশক্তি, প্রবল ইচ্ছাশক্তি এবং তার চলমান প্রক্রিয়া। সেই প্রবল ইচ্ছাশক্তি মানুষকে বদলে ফেলে আমূল। একদিনে আপনি নিজেকে বদলে ফেলতে পারবেন না। আপনাকে প্রতিদিনই রপ্ত করতে হবে পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায়। ভালোবাসতে হবে নিজেকে এবং ভালোবাসতে হবে অন্যকে। এর মাঝে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন নিজেকে বদলে ফেলার কিছু অভাবনীয় যাদু!

 

চিন্তা করে দেখুন, আপনি একজন স্বাস্থ্যবান মানুষ। এই স্বাস্থ্যবান মানে কিন্তু ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষকে বোঝানো হচ্ছে না। এই স্বাস্থ্যবান মানে বরং স্থুলকায় দেহ! তার মানে শারিরিক আকার-আকৃতিতে আপনি বড়, মেধা ও মননে নয়। তার উপর আপনি যদি খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে জাপানি সুমো কুস্তিগীরের মতো দেহ বানিয়ে হেলেদুলে লাফিয়ে লাফিয়ে আশপাশ কাঁপাতে কাঁপাতে আসর মাতাতে পারেন তাহলে অন্য সবাই আপনাকে দেখে বেশ মজা পাবে এটাই স্বাভাবিক।  এরপর একদিন ভূমিকম্পের কারণে একটু মাথা ঘুরছে, মনে করলেন ক্ষুধা পেয়েছে তাই আবার অভূক্ত না হওয়া সত্তেও খাবার খেলেন।

 

আপনি কি চান আপনার শারিরিক আকার-আকৃতি ঠিক রাখতে বা শরীরের বাড়তি মেদ যেমন আছে তেমন রাখতে। তাহলে ‘আমার বলার কিছু ছিলো না’ গাইতে গাইতে ভিন্ন পথে পা বাড়াবো। আচ্ছা আপাতত কিছু ভাবতে পারি। এই যেমন শরীরের বাড়তি মেদ কমিয়ে একটু চিকন-চাকন বডি বানিয়ে ফিরে আসতে। বাহ্! সবাই নিঃসন্দেহে ভালো বলবে। এবং আপনাকে দেখে শেখার আগ্রহ বাড়িয়ে দিবে।

 

এ তো গেলো শারিরিক ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে কিছু প্রাসংগিক কথা। এবার না হয় মানসিক পরিবর্তন সর্ম্পকে কিছু বলতে পারি। অর্থাৎ স্বভাব – চরিত্র , আচার – আচরণসহ মেধা ও মননে পরিবর্তন আনা। এজন্য আপনাকে নিয়মিতভাবে কিছু টাস্ক বা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। থেমে থাকলে চলবে না। প্রয়োজনে নিয়মিত মেডিটেশন চালিয়ে যেতে পারেন। এতে করে আত্মবিশাস বেড়ে যাবে। আপনার পক্ষে লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ হবে।

 

আমার একটা নেতিবাচক দিক ছিলো কেউ খারাপ বললে, কেউ কটাক্ষ করলে একেবারে হতাশায় ডুবে থাকতাম এবং প্রচন্ড মন খারাপ হতো। অনেক সময় বাথরুমে গিয়ে নিজের দুগালে প্রতীকি থাপ্পর বসাতাম এবং ধিক্কার দিতাম নিজের ভাগ্যকে। হয়তো অনেকের এরকম হতে পারে। এভাবে আমরা প্রতিনিয়ত নিজের ক্ষতি নিজেই করি অগোচরে। তবে এখন আর এরকম নেতিবাচক ভাবনাকে মোটেও পাত্তা দিই না বা ভালো চোখে দেখি না।

 

এখন যা ভাবি তাতে করে আপনি কিছুটা অবাক হবেন এই ভেবে আগে কি করতাম আর এখন কি করি। কেউ কটাক্ষ করলে, মন্দ বললে তিনি যতো ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী ব্যক্তি হন না কেনো প্রথমত সেটাকে সোজাসাপ্টাভাবে Ignore করি। এতে করে মানসিকভাবে প্রশান্তি অনুভব করি। দ্বিতীয়ত যখন নিজের আবেগ প্রশমিত হয় তখন তার ভালো-মন্দ দিক বিবেচনা করতে সচেষ্ট হই। এতে করে অনেক সময় নিজের ভুল বুঝতে পারি। তৃতীয়ত অন্যকে ভুল শোধরানের সুযোগ দিয়ে তৃপ্তি লাভ করি। এতে করে দ্বিতীয় পক্ষ অনেক সময় সঠিক বিষয় আত্মপোলব্ধি করতে সক্ষম হবে।

 

হয়তো বলবেন, এতো বদলানোর প্রয়োজনটাই বা কী? আমার যথেষ্ট প্রভাব- প্রতিপত্তি আছে কিংবা আমি অন্যকে ধমক দিয়ে ও জোরে জোরে কথা বলার কারণে অন্যেরা বিনা বাক্যব্যয়ে আমার কথা শোনে। অবশ্য সেটা আপনার বিষয়, এতে আমাদের হাত নেই। তবে বর্তমান জামানায় আপনার এ থিওরীতে দুনিয়া চলে না। অনেক সময় অন্যের সংগে কঠিন ভাষায় কথা বলতে হয়, সেটা একান্ত বাধ্য হলে এরুপ আচরন প্রয়োগ করতে পারেন।

 

নিজেকে বদলানো মানে খারাপ কিছু নয়, ইতিবাচক দিক সমূহ ঝেটিয়ে বিদায় করানো নয়। বরং নেতিবাচক দিক সমূহ পরিত্যাগ করে নিজেকে বদলে ফেলা। এ ধরনের বদলে ফেলাতে আছে প্রশান্তির অনুভব। নিজেকে বদলে ফেলাতে আছে এক গভীর আকুতি, ভেতরে বহমান আনন্দ!

 

তবে কারো কথায়, কারো মিথ্যে ভালোবাসার আশায় নিজেকে বদলে ফেলো না। নয় তথাকথিত নেতার কথায়, নয় কোনো মরীচিকা নামে গোলকধাঁধায়। যে বদলে ফেলার মাঝে সুস্থিরতা নেই, নেই প্রশান্তির অনুভব সে ধরনের বদলে ফেলা হবে বোকামির নামান্তর। এ থেকে যতো দূরে থাকা যায় ততোই মঙ্গল।

 

বরং নিজেকে বদলাতে চাই ইতিবাচক দিগন্তে। এজন্য মেধা ও মননে চাই পরিবর্তন যা কার্যকর ও সহায়ক ভূমিকা রাখে। এবার বিশ্বের একজন প্রথিতযশা ব্যক্তির বক্তব্য শুনতে আশা করি ভালো লাগবে। তিনি ড্যানিয়েল সল গোল্ডিন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার সাবেক অ্যাডমিনিস্ট্রেটর (১৯৯২-২০০১)। তাঁর প্রিয় মানুষ ও আদর্শ ব্যক্তি বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলাই। ২০০১ সালের ৮ জুন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি  বলেন, “গ্যালিলিওর মতো তোমরাও স্বাপ্নিক হও, সৃজনশীল ও সাহসী হও। মনে রাখবে, ভয় নামের ঘোর কুয়াশা ও নিন্দুকের সমালোচনার আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারে অজানা কোনো সত্য। এই সত্যকে জানতে হলে প্রাণে সাহস থাকা চাই। অবশ্যই নিজের ওপর আস্থা রাখতে হবে। অজানাকে জানার অদম্য ইচ্ছা ও কৌতূহল থাকতে হবে, লক্ষ্য হতে হবে অটুট।”

অনেকে নিজের মতো থাকতে চান। ইচ্ছে করে তথাকথিত বদলাতে চান না। তার নিজস্ব যুক্তি রয়েছে। তিনি লোক দেখানো পরিবর্তন চান না। তার মাঝে সরলতা কিংবা আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই। অনেক আগেই তিনি নিজেকে বদলে ফেলেছেন। তার কথা, “আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।” এটাকে এর ধরনের আত্মভিমান বলা যায়। কাউকে সহযোগিতার পরও মনের মধ্যে যে খচ্খচানি রয়ে যায়। আর এজন্য দায়ী আমাদের সমাজ ব্যবস্থা। সমাজপতিরা তো ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালীদের কথার গুরুত্ব দেয় অধিক।

 

তারপরও বলবো, নিজেকে বদলানোর কোনো বিকল্প নেই। চারিদিকে যখন ক্ষমতালিপ্সু, দলকানা, ব্যক্তির স্বার্থকে মূখ্য করে দেখা হয় সেখানে আমার মতো আম-আদমির কিইবা প্রয়োজন থাকতে পারে। তথাপি আপনি ভাবতে পারেন, কে কী মনে করলো, কে কী ভাবলো তাতে কিছু যায় আসে না। যে পরিবর্তন আপনাকে সাহস যোগাতে সক্ষম সেই পরিবর্তনই চাই। “Everything change; and I also expect a good change.” 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>