এক নাদান মুসাফিরের আত্মলিপি (পর্ব-৪)


এক নাদান মুসাফিরের আত্মলিপি (পর্ব)

প্রথমত আমি একজন নগন্য মানুষ। ক্ষমতা, প্রভাব, প্রতিপত্তি বলতে আমার কিছু নেই। দ্বিতীয়ত আমার শিক্ষা-জ্ঞান অতি সামান্য। আমাকে প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু বিষয় শিখতে হয়। বলতে গেলে আমি একজন সাধারন শিক্ষার্থী। মার্জনা করবেন, একারণে আমি সবার কাছ থেকে শিখতে চাই। আজকের আলোচনার বিষয় এক নাদান মুসাফিরের আত্মলিপি (পর্ব-৪) লাগামহীন ঘোড় সওয়ারে সামাজিক দায়বদ্ধতা।

 ek nadan musafir-4

‘আমি এক বেখেয়াল মাঝি পথ ভুলে মগ্ন রই

তবু কেনো বুঝি না আমি তো শুধু একার নই!

একূল ওকূল দুকূল হারিয়ে ক্ষণিকের আমির

হায়রে পোড়া কপাল এক নাদান মুসাফির!’

 

লাগামহীন ঘোড় সওয়ারে সামাজিক দায়বদ্ধতা

শুধুমাত্র একা থাকার বা শুধু একার জন্য আমরা পৃথিবীতে আসিনি। তাছাড়া সামাজিক জীব নামে আমাদের গায়ে একটা তকমা লাগানো রয়েছে। ইচ্ছে করলে তা ছুটানো সম্ভব নয়। আর মাঝে মাঝে সেটা ভুলে যাই আমি এক নাদান মুসাফির।

 

সবারই কিছু না কিছু সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে পথ চলাতে সচেষট আমি। কেনো যেনো চুপচাপ বসে থাকতে পারছি না। সম্প্রতি ‘বস  টু’ নামে একটি সিনেমার গানে বাংলাদেশের একজন উঠতি নায়িকা নুসরাত ফারিয়া একেবারে বেসামাল পোষাকে একটি আইটেম গান পরিবেশন করেছেন। আমরা সাধারনত ধরে নিই কিংবা বুঝে নিই এধরনের গানে মডেল কইন্যারা খুললাম খুললাম বলে চরম অস্থিরতা প্রদশন করে। কিন্তু এরকম একটি অশালীন টাইপের গানে কিভাবে ‘আল্লাহ মেহেরবান’ জাতীয় পবিত্র বিষয়কে উপস্থাপনা করা হয়? কখনো এদের জন্যে আল্লাহ মেহেরবান হতে পারেন না। আমি প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। এতো নোংরা পোষাকে, জঘন্য  উপস্থাপনায় মহান রাব্বুল আলামিনকে পক্ষান্তরে কটাক্ষ করা হয়েছে। একজন মুসলমান নামধারী হয়ে কিভাবে ইসলাম ধর্মকে এভাবে তুচ্ছ তাচ্ছল্য করতে পারেন? এইসব রোবট নায়িকাকে আমাদের বয়কট করা দরকার। আমাদের সাম্প্রতিক সময়ের একটি সাহসী ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বিষয়টি কখনো ভেবে দেখেছেন? এ বিষয়ে তাদের তৎপরতা কি ছিলো? তারা বিষয়টি নিয়ে কখনো প্রতিবাদ করেছেন?

 

একটি ধর্মীয় সংগঠন হলে যে কেবল ধর্মীয় বিষয় নিয়ে প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে, তা হতে পারে না? সামাজিক বিষয় নিয়েও সরব হওয়া চাই। তাছাড়া সামাজিক দায়বদ্ধতা বলে কথা আছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় বিঘ্নতা হচ্ছে কিনা অবশ্যই তাদের ভেবে দেখা দরকার। জনগণের টাকা কোনোভাবে তসরুপ হচ্ছে কিনা সেটাও বিবেচনা করতে হবে।

 

জনকল্যাণ নিহীত রয়েছে এমন কাজে আমাদের সমর্থন দেওয়া নৈতিক  দায়িত্ব। এটা সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে পড়ে। সম্প্রতি যে বাজেট পেশ করা হয়েছে সেটা প্রসংগে আমাদের এইসব ধর্মীয় সংগঠন থেকে কিছু না বলা হলেও আমি কিছু বলতে চাই। জনকল্যাণমূলক কাজে কি তাদের নৈতিক  দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?

বাজেটে নতুন একটি বিষয় অন্তর্ভূক্তি করা হয়েছে তা হচ্ছে ব্যাংকে টাকা রাখলে আবগারি শুল্ক কাযকরা নিয়ে। সরকারের এই প্রস্তাবনার সমালোচনা করে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার তার ভেরিফাইড ফেসবুক  পেজে লিখেছেন, ‘অভিনব! টাকা ব্যাংকে রাখলেও কেটে নেবে সরকার। পকেটে রাখলে পকেট কাটবে, বেডরুমে রাখবেন? বেডরুমে তো মানুষেরই নিরাপত্তা নাই! বাকি থাকল শেয়ার বাজার। হা হা হা। কি যে বলি! বললেই তো হামলা-মামলা!’ সত্যিই বিষয়টি আক্ষেপের।

ব্যাংকে টাকা রাখলে আবগারি শুল্কের এমন কোনো নিদর্শন বিশ্বের কোনো দেশে আছে কিনা প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক। একাত্তর টেলিভিশনের একজন সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘যারা লুটপাট করে টাকা বানায় তারা পাচার করে, তাদের কিছু করতে পারে না সরকার, ব্যাংকের টাকা যারা লুট করে, খেলাপি হয় তাদেরও সবসময় সুদিন…. সরকারের নজর এখন সাধারণ মানুষের উপর যারা কষ্ট করে সঞ্চয় করে কিছু টাকা রাখে ব্যাংকে। বিনিয়োগের জায়গা নেই, স্টক মর্কেট ধ্বংস হয়ে গেছে..,তাহলে মানুষ করবে কি? ব্যাংকে রাখলে বাড়বে তো নাই, উল্টো সরকার কেটে কমিয়ে দিবে.. মানুষকে ব্যাংক বিমূখ করার ভালো উদ্যোগ… আর অর্থ বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার পথ উন্মুক্ত করা…।’

 

একজন অথনীতিবিদ আবগারি শুল্ককে বলেছেন পাপমোচন হিসেবে। এটা কার্যকর করা হতো মাদক, সিগারেট এই জাতীয় পন্যের ক্ষেত্রে। এতে শুল্ক প্রয়োগ করা হতো পাপমোচন করার জন্যে। কিন্তু ধনীদের উপর বেশি কর আরোপ না করে সামান্য আয়ের মানুষের এভাবে চাপিয়ে দেওয়া করের বোঝা কিভাবে কল্যাণ বয়ে আনে তা নাদান মুসাফিরের কাছে বোধগম্য না।

যখন ৭৫ হাজার কোটি পাচার হয়ে যাওয়া সত্তেও সরকার এটাকে হালকাভাবে নিতে শিখে গেছে। কতো উদার আমাদের সরকার, বুঝে নিতে হবে কিসে তা দরকার! কিন্তু ভ্যাটের পরিমাণ কমাতে গেলেই গা জালা করে। বাজেট হওয়ার পর আমাদের দেশে জিনিষপত্রের দাম বাড়ে। গুরুর মাংসের দাম বেড়ে কেজি ৭০০ টাকা ছুঁই ছুঁই করলে দাদাবাবুরা খুশিতে আটখানা, বিবিসি নিউজ পড়লে তা বুঝতে পারবেন মশাই! যারা জনগণের টাকা পকেটে পুরে রাখছে কিংবা পাচার করছে তারা তো দিব্যি সুখে আছে। ঋণ খেলাফিদের কেউ ধরে না। এরা জনগণের টাকা তসরুপ করছে। এদের কিছু হচ্ছে না, যতো দোষ নন্দঘোষ জনগণের! একজন মাইটিভির সাংবাদিক খুব আক্ষেপ করে মাননীয় অথমন্ত্রীকে বলেছেন, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের মেরে ফেলুন, তাদেরকে শেষ করে ফেলুন। অর্থাৎ তাদের বেঁচে থাকার দরকার নাই। সত্যিই নিদারুন কষটের ব্যাপার!

 

khundkar hasan shahriyar নামে একজন এডভোকেট তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘আমি বেকার? বেকার ভাতা পাই? উত্তর-না।

স্বাস্থ খাতে কোনো বিশেষ সুবিধা আছে,এই দেশের নাগরিক হিসেবে? উত্তর-না।

বৃদ্ধবয়সে সরকার আমাকে দেখবে?কোনো বৃদ্ধাশ্রম,বয়স্ক ভাতা? উত্তর-না।

চাকরি জীবন শেষে .সরকারের পক্ষ থেকে কোনো .অবসর ভাতা? (যেটা,অনেক দেশে ব্যবস্থা আছে) -উত্তর-না।

অনেক টাকা খরচ করে গারি কিনেছি, যে গারির আসল দাম ৫ লক্ষ (জাপানী দাম) ,দেশে ট্যাক্স দিয়ে দাম দাড়ায়, ২০ লক্ষ (শোরুম থেকে কেনা,রিকন্ড্শন্ড)। এই দামে বিদেশে লোকজন ব্র্যান্ড নিউ গারি কিনে (mercedes ও পাওা যায়) । এই ট্যাক্স এর বিপরীতে সরকার আমাকে কি এমন সুবিধা দিচ্ছে দেশে?? কোনো বিশেষ কিছু? ভালো রাস্তা??ভালো নিরাপত্তা ব্যবস্থা??? সবগুলোর উত্তর-না।

অলরেডী আয়কর দেই, জমির কর দেই, ব্যবসার কর দেই, আমদানি-রফতানির কর দেই,আবার সঞ্চয়ের ও কর দেই , উৎসকর দেই, এখনকি তাইলে ,ব্যাঙ্কে টাকা ফেলে রাখি বলেও কর দেওয়া লাগবে?

 

একমাত্র সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীর বেতন, আর বিভিন্ন সরকারী মেডিকেলে ডাক্তার দের পড়ানোর আকাশ্চুম্বি খরচ কমানো ছারা তো আমার কোন preference দেখিনা।

 

আমি কেন ট্যাক্স দেব?? সরকারের অনেক ব্যবহার আছে ট্যাক্সের,আমার ব্যবহারটা কোথায়??’

 

তাহলে এক্ষেত্রে আমরা কিইবা করতে পারি। হয়তো নিজেরা কিছুটা সচেতন হতে পারি। ন্যুনতম সামাজিক দায়বদ্ধতায় কোনোরকমে টিকে থাকতে পারি। এটাই বা কম কিসে। বিন্দু বিন্দু জল থেকে তো সাগর হয়…

আমরা সাধারন মানুষ অশিল্পকে শিল্প বলে চালিয়ে দেওয়া ভাস্কর্য বা মূর্তি বলতে কিছুই বুঝি না! কেনোইবা এতো বিতর্ক? তবে জানি, লাগামহীন ঘোর সওয়ারের প্রতিযোগিতা একদিন শেষ হবে। না হয় সেদিনের অপেক্ষায়…

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>