এক নাদান মুসাফিরের আত্মলিপি (পর্ব-১) 2


এক নাদান মুসাফিরের আত্মলিপি (পর্ব-১)

সময়ের সাথে সবকিছু বদলে যায়, মানুষের মন, মানুষের চিন্তার খোরাক। এরকম সময়ের আমার কিছু ভাবনা ও অনুধাবন। আজকের আলোচনার বিষয় এক নাদান মুসাফিরের আত্মলিপি (পর্ব-১) এ কেমন সময়ের দিনলিপি।

কেমন সময়ের দিনলিপি

একজন আনকোরা মুসাফিরের আনকোরা লেখা চিন্তার কি খোরাক জোগাতে পারে? তাই তো যদিও চারিদিকে অস্থিরতা, ‘জোর যার মুল্লুক তার’, ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার প্রচন্ড প্রতিযোগিতা, ‘জীবে হত্যা মহাপাপ’ এর ছদ্মবেশে অমানুষিক নির্যাতনে মানুষ হত্যা (বার্মায় মুসলিম গণহত্যা) করছে নির্বিচারে, অনেকক্ষেত্রেই মুসলিমদের নামে অপবাদ, ঠিক এমন সময়ে আমার দিনলিপি লেখা শুরু করছি। ভাবতে গেলে, সত্যিই বড়ই বেমানান লাগছে সবকিছু। এছাড়া অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ভাসছে এ ‍শহর!

এমনি সময়ে আমার আগমন যেনো নিছক এক মুসাফিরের আত্মসমর্পন। আমি কোনো গায়কও নই কিংবা চাপাবাজ কোনো নেতা বা বসও নই। এমন কি আহামরি কোনো ভিলেনও নই। আজকাল তো ভিলেনের খুব কদর। ভিলেন থেকে নায়ক হতে পারলে যেনো মার মার কাট কাট অবস্থা, বলা যায় হাউজফুল!

তাহলে আমি কি? মুরুভূমির বুকে চুপচাপ পড়ে থাকা এক বোবা উটের মতো মুখ বুজে আছি যেনো। আর কতকাল এভাবে পড়ে থাকা? হয়তো কিছু সময়ের জন্যে চুপচাপ থাকা। আর কতটা পথ পাড়ি দিতে হবে? অপেক্ষার প্রহরে কেবল খুঁজি ফিরি এক অচেনা মুসাফিরের বেশে!

তেমন কোনো যোগ্যতা নেই আমি নাদান এক মুসাফিরের। তবে নিশ্চয় আমার ঘৃণা করার যোগ্যতা রয়েছে, আলবৎ রয়েছে। যখন এই স্বাধীনদেশে মুক্তিযোদ্ধাকে পিটিয়ে হত্যার পরও তাৎক্ষণিক কোনো অ্যাকশন হয় না কিংবা ই-টেন্ডারে কোনো মুক্তিযোদ্ধা কাজ পাওয়ার মাথায় হাত-পা ভেঙ্গে ফেলার পর কোনো সুষ্ঠু বিচার-আচার হয় না তখন আমি ঘৃণা করতেই পারি এবং প্রচন্ডভাবে ঘৃণার আগুণে বিস্ফোরিত হতে পারি। অবশ্যই আমার সে যোগ্যতা রয়েছে। তবুও আপনি চুপ করে থাকবেন?

এটা তো রীতিমত মানবতার চরম বিপর্যয়! আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ বার্মায় মুসলিমদের উপর অমানুষিক নির্যাতন নেমে এসেছে যা যেকোনো সভ্য দেশের বর্বরতাকে হার মানায়। যেকোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা বিরোধীদলীয় নেতা পৃথিবীতে যে প্রান্তে হোক অমানবিক আচরণ দৃষ্টিগোচর হবে তার বিরুদ্ধে সরব হবে এটাই নিয়ম। অথচ বাংলাদেশের নেতাগণ এক্ষেত্রে নিরব বা বেমালুম ঘুমিয়ে আছে অন্ধের মতো, আমার মাথায় আসছে না। কিছু কিছু ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিবাদ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। নিজেদের স্বার্থের বেলায় এরা কেবল উচ্চকন্ঠে হায়দরী হাক ছাড়েন!

আর কতোকাল আপনি ধর্মের দোহাই দেবেন, ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিবেন? ইচ্ছে হলেই নিজের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করবেন আবার ইচ্ছে হলেই বলবেন ‘আমি কখনোই বিশ্বাস করি না, ইসলাম ধর্ম বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম থাকা উচিত। এটা আমাদের কৌশল। আমরা সুযোগ পেলে, সময় পেলে ইনশাহ আল্লাহ এটাকে সংবিধান থেকে তুলে দেব’, এই তো! ইসলাম কি ছেলের হাতের মোওয়া যে আপনার স্বার্থের জিগিড়ে উচ্চকিত হবেন, ধিক্ আপনাকে, ততোধিক ধিক আপনার কর্মকান্ডের!!

‘তুমি তো আমার জিনা মুশকিল করে দিলা’ প্রায় পাঁচ বছর বয়সের আদিব এই কথা বলে, তখন তো আমার চক্ষু চড়কগাছ! ছেলে বলে কি? এ কেমন সময়ের দিনলিপি আমার, হতভাগ্য এক পিতার আফসোস হয় বটে! কিন্তু আমার তৎক্ষণাৎ স্মরণে আসে বেশকিছু দিন আগে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের এক মন্ত্রী বেশ আবেগের সঙ্গে গদগদ হয়ে ভারতের এক চ্যানেলের সহিত সাক্ষাতের সময় বলেছিলেন, ’৭১ সন কা মুক্তিযুদ্ধ মে পাকিস্তান হামকা বিরুদ্ধে থা, পাকিস্তান হাম সাথ লড়াই কিয়া থা ওস টাইম…’ ইত্যাদি তখন আমার কিছুতেই বোধগম্য হয় না এটা কোন্ তরিকার ভাষা না শুদ্ধ হিন্দি, না শুদ্ধ উর্দু, না বাংলা। এটা কোন্ আবাল ভাষা? এর চেয়ে এক শিশুর মিশ্র ভাষা অনেক শ্রুতিমুধুর মনে হয়।

এই মিশ্র ভাষা ব্যবহারেও আমার আপত্তি, প্রবল আপত্তি। এর জন্যে কি আমাদের কর্তাব্যক্তিরা দায়ী নয়? কেউ কি কিরণমালা দেখে হিরণ হয়েছে বরং কিরণমালা দেখা নিয়ে কতো আত্মহনন এবং অপসংস্কৃতি বেড়েছে। স্টার জলসা, জিটিভি দেখার ফলে এ ধরনের মিশ্র ভাষার উদ্ভব হচ্ছে। আমাদের কর্তাব্যক্তিরা কোন্ মুল্লুকে বসবাস করেন? অথচ আমাদের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় একটু উদার মনোভাব নিলেই ভারতীয় সেইসব চ্যানেল বন্ধ করে দিতে পারেন যার ফলে আমাদের অপসংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে। আামদের পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালে সকল ভারতীয় চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ ওনি আমাদের মনের কথা শুনছেন না। আবারো মনে করিয়ে দেয় সে কথা, ‘তিনি আমাদের কথা রাখলেন না। তিনি রাখলেন ভুট্রো সাহেবের কথা!’ (উল্লেখ্য, অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তান এবং আমাদের মহান স্বাধীনতার স্থপিতির কথা স্মরণ করছি।) ইশারায় কাফি হ্যায়…

আমি তো আম-জনতার কাতারে এক নাদান মুসাফির। এ কেমন সময়ের দিনলিপি আমার। বলতে গেলে, আমরা এক হতভাগ্য জাতি। একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন মীর মোশাররফ হোসেন। এই প্রথিতযশা লেখক লিখেছিলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন’। অত্যন্ত কঠিন হলেও বাস্তবতা অনেকটা এমনই আজ।

আমাদের স্বকীয়তায় আমাদের বাঁচতে হবে। আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে ফিরে আসতে হবে। অপসংস্কৃতি আমাদের মনের বিকাশ ঘটাতে পারে না। পারে না পারিবারিক ও সামাজিকভাবে উন্নয়ন ঘটাতে। পৃথিবীর কোনো মানুষই ভুলের ঊর্দ্ধে নয়, আমরাও কিছুটা নিমজ্জিত রয়েছি ভুলের সাগরে। এবার ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জেগে ওঠার আহবান! এক নাদান মুসাফির এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করতে পারে, তাই তো মনের অজান্তেই এক দীপ্ত উচ্চারণঃ

“যদি কাঁদতে চাও আরো কাঁদো

মন উজাড় করে কাঁদো

প্রার্থনায় কাঁদো

এবং সমর্পনে কাঁদো…

 

কাঁদতে কাঁদতে মুছে ফেলো দু’চোখের জল

আর কান্না নয়, দুঃখবোধ নয়

ক্রোধের আগুণে গর্জে ওঠো

এই নাও শপথের অস্ত্র…

 

এবার মোকাবেলা হবে অস্ত্রাঘাতে

টুকরো টুকরো ক্রোধ

এবার বিস্ফোরিত হবে উন্মাতাল তরঙ্গে

সবকিছু তছনছ করে গর্জে ওঠো!”


Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

2 thoughts on “এক নাদান মুসাফিরের আত্মলিপি (পর্ব-১)